রবীন্দ্রনাথ এর সমালোচনা -প্রশ্ন এবং জবাব


রবীন্দ্রনাথ এর সমালোচনার সময়ে আমি কিছু কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি।চেষ্টা করেছি সেগুলোর যথাযথ উত্তর দিতে।তবে পাঠকরা সে উত্তরে খুশি হতে পেরেছেন কিনা জানিনা।সম্প্রতি সদালাপে ’রবীন্দ্র সমালোচনা- অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক কেন রবীন্দ্রনাথকে বড় মানুষ ভাবতেন না?’   [ PDF]শিরোনামে আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে।লেখাটা প্রকাশিত হওয়ার পর কয়েকজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এর সমালোচনার মুখে পড়ে যাই।মানুষ হিসাবে আমার ভুল হতেই পারে তবে,রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক কোন আলোচনার ক্ষেত্রে সে ভুলটা আমার হওয়ার কথা নয়।দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে আমি লেখাটি লিখেছি।তথ্যসূত্রের বেলায় আমি কোন হুজুগে তথ্য দেইনি। ইন্টারনেট থেকেও কোন তথ্য ধার করিনি।তথ্যগুলো আমি সরাসরি বই থেকে সংগ্রহ করেছি।বই পড়ার সুবাদে সমালোচকদের সমালোচনার জবাব জবাব দিতেও আমার কোন সমস্যা হয়নি।লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর সিনিয়র ব্লগার ‘আবু সাঈদ জিয়া’ ভাই আমাকে রবীন্দ্র বিদ্বেষী হিসাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন।সদালাপে তিনি আমার লেখায় মন্তব্য করেন।আমার এই পুরো লেখাটি জিয়া ভাইয়ের মন্তব্যর জবাব নিয়ে সাজানো।
জিয়া ভাইয়ের মন্তব্যগুলো সব কৌট করা-

রবি ঠাকুরের সমালোচনকের সংখ্যাও কিন্তু কম নেই — আজও আছে। তবে ব্যক্তি রবি ঠাকুরের সমালোচনা করার লোক খুবই কম। কারন বিষয়টা অনেকটা হীনমন্যতার নিদর্শন বটে। বাংলা সাহিত্য আর ভাষায় রবীন্ত্রনাথের অবস্থান নিয়ে কোন সংশয় বোধ হোক সবচেয়ে কঠিন সমালোচকেরও নেই।

১.কেন এবং কোন যুক্তির উপর নির্ভর করে আপনি বলছেন “ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ এর সমালোচনা হীনমন্যতার নিদর্শন”? রবীন্দ্রনাথ এর ব্যক্তিগতজীবন যদি ত্রুটিপূর্ণ হয় তাহলে কেন তাঁর সমালোচনা করা যাবেনা? তাহলে কি আপনি বলতে চাচ্ছেন যারা রবীন্দ্রনাথ এর ব্যক্তিগত ত্রুটিগুলো নিয়ে সমালোচনা করেছেন -সবাই মনের দিক থেকে হীনমন্যতা প্রদর্শন করেছেন? ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ এর সুখ্যাতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, কিন্তু তাঁর কুখ্যাতি ইতিহাস থেকে ছেটে না ফেলে প্রকাশ করা কি হীনমন্যতার নিদর্শন হবে?

২.বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবস্থান নিয়ে আমার সংশয় এখানে প্রকাশ পেয়েছে কিনা বুঝতে পারছিনা।তবে আমি লেখায় যে উদ্বৃতি দিয়েছি সবগুলোরই দ্রষ্টব্য দিয়েছি।তথ্যসূত্র হলো ইতিহাসের প্রাণ আর সে তথ্যসূত্রে যদি রবীন্দ্রনাথ এর অবস্থান সাহিত্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয় তাহলে কিছু করার নেই।শ্রেফ সাহিত্যে তাঁর অবদান, সামান্য প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় আমি তা চেঁছে ফেলে দিতে পারিনা!

অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের নাম করে আপনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকর সম্পর্কের নিজের মনোভাবটাই প্রকাশ করলেন — সেই ভাল। আমরা আরেকজন রবীন্দ্র সমালোচক পেলাম। ভাগ্য ভাল যে এই সুযোগে কাজী নজরুল ইসলামকে টেনে আনেননি।

৩.হতে পারে নিজের মনোভাব এর কিঞ্চিত বা পূর্ণ প্রকাশ।তবে আমি রবীন্দ্র সমালোচক কিনা এই বিষয়ে আমার নিজেরই সংশয় রয়েছে বেশ,কারণ আমি রবীন্দ্রনাথ পাঠ ও করি, সাহিত্যরস নিই।ত্রুটিহীন রবীন্দ্রনাথ এর প্রসংশা ও করতে চাই।আমি রবীন্দ্রনাথ কে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখি।রবীন্দ্রনাথ এর ত্রুটি ঝেড়েমুছে পাঠ আমার পক্ষে সম্ভবনয়।
৪.নজরুল রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে সেরকম কোন মন্তব্য করেছেন কিনা আমার জানা নেই,তবে চাইলেই শরৎচন্দ্রকে টানতে পারি।

যাই হোক আপনার সমালোচনার মুল বিষয় হলো রবি ঠাকুর জমিদার ছিলেন। সেই জন্যে উনি খারাপ মানুষ ছিলেন। জমিদার সন্তান জমিদার হবে এইটাইতো স্বাভাবিক নয় কি? উনার জন্যে বরঞ্চ বিপ্লবী হয়ে জমিদারী ছেড়ে প্রজা হওয়াই ছিলো অস্বাভাবিক।

৫.জমিদার সন্তান জমিদার হবেন এটাও যেমন অস্বাভাবিক নয় তেমনি জমিদার পুত্র যদি প্রজাহিতৌষী না হয়ে অত্যাচরী হোন, তাঁর ও তো সমালোচনা হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়।আবার জমিদারীর তল্পিতল্পা গুটিয়ে প্রজা হওয়া অস্বাভাবিক হোলেও প্রজাদরদী হওয়া স্বাভাবিক ছিলো।প্রজাদের মাথায় কাঠাল ভেঙ্গে নিজের পুত্রের জন্য সম্পত্তি না গড়লেও তিনি পারতেন কিনা? এটা তাঁর জন্য অস্বাভাবিক ছিলোনা;

“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাইভেট সেক্রেটারী অমিয় চক্রবর্তী একবার বিশাল জমিদারীর একটি ক্ষুদ্র অংশ দরিদ্র প্রজাসাধারণের জন্য দান করার প্রস্তাব করেছিলেন।ঠাকুরমশাই ইজিচেয়ারে আধাশোয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বলেছিলেন, “বল কিহে অমিয়। আমার রথীন (কবির বেঁচে থাকা পুত্রের নাম) তাহলে খাবে কী?[দ্রঃ অন্নদাশঙ্কর রায়ের রচনা থেকে উদ্ধৃত পুস্তক ‘রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তাধারা: আবু জাফর]

তবে জমিদারী সম্পর্কে উনার একটা মন্তব্য দেখতে পারি —
জমিদারী প্রথার বিরুদ্ধে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি নির্মম সত্য কথা বয়ান করে গেছেন। তিনি বলেছেনঃ
“আমি জানি জমিদার জমির জোঁক। সে প্যারাসাইট, পরাশ্রিত জীব।আমরা পরিশ্রম না করে, উপার্জন না করে, কোন যথার্থ দায়িত্ব গ্রহণ না করে ঐশ্বর্য ভোগের দ্বারা দেহকে অপুট ও চিত্তকে অলস করে তুলি।যারা বীর্যেরর দ্বারা বিলাসের অধিকার লাভ করে আমরা সে জাতির মানুষ নই। প্রজারা আমাদের অন্ন জোগায় আর আমলারা আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেয়- এর মধ্যে পৌরুষও নেই, গৌরবও নেই (কালান্তর,পৃঃ ২৯৪)।
– সেই সময়ের শত শত জমিদার ছিলো — তাদের কেউই সাহিত্য চর্চাও করেনি — তাদের অনুশোচনাও দেখিনি।
যাই হোক — আমার গ্রামে একটা কথা চালু আছে — মানুষ উঁচু গাছেই ঢিল মারে — কিছু পাবার আশায়। রবি ঠাকুরে বিশালতাই সমালোচকদের ঈর্ষার কারন — এই ছাড়া আর কি!

৬.উনি জমিদারী নিয়ে বেশ লিখলেন বটে অনুশোচনাও করলেন বটে তবে প্রজাদের উপর জোড় করা সম্পদ কি উনি প্রজাদের ফিরিয়ে দিলেন? উনি জমিদারী নিয়ে লিখলেন বটে, কিন্তু জমিদারী সে সময়ই ছাড়লেন কি?
আমার লেখার শেষে সৈয়দ আবুল মকসুদ এর বই থেকে এইটুকু আপনার অবশ্যপাঠ্য-

“ধরা যাক, একজন কথাশিল্পী এমন এক কাহিনী লিখলেন যেখানে প্রধান চরিত্র বিপ্লবী-বিদ্রোহী ও কুসংস্কারেরর বিরুদ্ধে আন্দোলনরত কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে লেখক নিজে সুবিধাবাদী সমাজের শত্রুদের সঙ্গে একাসনে তাঁর অবস্থান এবং প্রগতিবিরোধী-তাহলে কি তাঁকে আমরা মহৎ ব্যক্তি বলব?’

৭.আমি রবীন্দ্রনাথ কে নিয়ে কোন কিছু পাবার আশায় লিখিনি,বা রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করলেই আমি বিভিন্ন মহল থেকে বাহবা পাব এমন আশা ও করিনা।যদি আমাকে আপনি আপনার উল্লেখ্য ব্যক্তিদের কাতারে ফেলে দেন তো সেটা আমার জন্য দুঃখজনক ও লজ্জাকর ব্যাপার।বাকিরা তাঁর প্রতি ঈর্ষান্বিত(আপনার মতে) হলেও আমি কোন ঈর্ষা থেকে লিখিনি বরঞ্চ আমি একজন ভালো রবীন্দ্র পাঠক হয়ে লিখেছি।

আমাদের মনের ক্ষুদ্রতা দিয়ে যেন আমরা কারো বিশালতাকে ঢাকতে না যাই — সেইটা আমাদেরই দৈন্যতার প্রকাশ হয়ে উঠবে।

৮.যদি আমাদের মনের ক্ষুদ্রতা শ্রেফ মিথ্যে হোলে সেটা দৈন্যতার প্রকাশ হতে পারে।কিন্তু সে যদি প্রমাণিত সত্য হয় আর সেজন্য যদি তাঁর কিছুটা ত্রুটি ধরা পরে তাহলে আমরা কেন বিশালতা রক্ষা করতে সেগুলো চেপে যাব?সর্বোপরি-রবীন্দ্রনাথ একজন মানুষ দেবতা তো নন যে তাঁর ভুল হবেনা।আর ভুল হলে তাঁর আলোচনা-সমালোচনা অত্যাবশ্যক। যেহেতু তিনি আমাদের সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।আপনাকে আবারো ধন্যবাদ পাঠ ও সমালোচনার জন্য।ভালো থাকুন।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s